খবরের বিস্তারিত...

FB_IMG_1618721884682

করোনাকালীন লকডাউনঃ প্রাসঙ্গিক কিছু কথা—এইচ এম মুজিবুল হক শুক্কুর

বিগত ২০১৯সালের ডিসেম্বর মাসে গণচীনের খুবেই প্রদেশের উহান শহরে থেকেই উৎপত্তি করোনা নামক এ অভিশপ্ত ভাইরাস এর। অতঃপর ধীরে ধীরে বিশ্বব্যাপী বিস্তৃতি ঘটে এটির। সংক্রমিত হয় ইউরোপ আমেরিকা ও ইতালীসহ বিশ্বের প্রায় ২২০টিরও অধিক দেশ। এ মহামারির তাণ্ডবে লন্ডভন্ড হয়ে যায় প্রায় গোটা বিশ্ব। যেটির বিষাক্ত ছোবল থেকে রেহাই পায়নি প্রিয় মাতৃভূমি এ বাংলাদেশও। বিশ্বব্যাপী প্রায় ৩০লক্ষ মানুষের অমূল্য প্রাণ কেড়ে নেয় এ অভিশপ্ত ভাইরাস। যা অবাক বিস্ময়ে প্রত্যক্ষ করে গোটা বিশ্ব। শুধু তাই নয়- এটি এমনি এক ন্যাক্কারজনক ইতিহাস সৃষ্টি করে, যা কোনভাবেই ভুলে যাবার নয়। একদিকে মানুষ স্বজন হারানোর বেদনায় বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ে। অপরদিকে আপনজনের অন্তিম মুহুর্তের বিদায় তথা দাফন কাফন-সৎকার থেকে বিরত থাকতে হয় দুঃখজনকভাবে। বিশ্বের চিকিৎসা বিজ্ঞান তথা সর্বপ্রকার গবেষনাকে অসার প্রমাণিত করে দেয় এ ভাইরাস। বিশ্বের শক্তিধর দেশ সমূহ উপায়ান্তর না দেখে দু’হাত তুলে দেয় আকাশের দিকে। অতঃপর বাংলাদেশেও ধীরে ধীরে বিস্তার লাভ করতে থাকে এ ভাইরাস। এমনিতর এক কঠিন পরিস্থিতিতে বিশ্বের প্রায় সকল দেশই মন্দের ভালো হিসেবে একমাত্র অবলম্বন হিসেবে বেচে নেয় লকডাউনকে। বিশ্বব্যাপী চর্চা হয় লকডাউনের। আর এটির উপরই জোর দেয় প্রায় সকল দেশ। ব্যতিক্রম হয়নি বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও। ফলে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে বিশ্ব যোগাযোগ ব্যবস্থা। ধ্বংসের মুখে পতিত হয় বিশ্ব অর্থনীতি। যাইহোক, বাংলাদেশে সংক্রমন তথা সার্বিক বিষয় সামাল দিতে সরকার সময়োচিত পদক্ষেপ গ্রহণ করে। দরিদ্র রাষ্ট্র হিসেবে সীমিত ব্যবস্থাপনার উপর অবিচল আস্থায় এগিয়ে যায়। বাংলাদেশে জনসংখ্যার তুলনায় চিকিৎসা ব্যবস্থার অপেক্ষাকৃত অপ্রতুলতা অস্বীকার করার কোন অবকাশ নেই। তথাপিও এক্ষেত্রে সরকারের পদক্ষেপ ছিল পরিকল্পিত। যেমন ঐসময় অধিকাংশ চিকিৎসকরা আতংকিত হয়ে চিকিৎসা সেবাদান থেকে বিরত ছিলেন। সেক্ষেত্রে চিকিৎসকদের নিরবচ্ছিন্ন সেবাদানে বাধ্য করেছে সরকার। অতঃপর ডাক্তার নার্সরা মৃত্যুভয় উপেক্ষা করে করোনা আক্রান্ত রোগীদের সেবায় এগিয়ে এসেছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, জাতির জনকের কন্যা, রাষ্ট্র নায়ক শেখ হাসিনার তড়িত পদক্ষেপে

বিভিন্ন হাসপাতালে করোনা ইউনিট সৃষ্টি, হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধি ইত্যাদি। এছাড়াও কঠিন লকডাউন এর ঘোষনা দিয়ে এবং তা বাস্তবায়নে কঠোর নজরদারী অব্যাহত রেখেছিলেন। লকডাউন কর্মহীন হয়ে পড়া গরীব-দুস্থ মানুষের জন্য বিশেষ প্রনোদনাসহ ব্যবসা-বানিজ্যের ক্ষতি পোষানোর নিমিত্তে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকার প্রনোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়ন করেছেন। যা সত্যিই প্রসংসার দাবী রাখে। তবে এক্ষেত্রে কিছু কিছু জায়গায় প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরা বঞ্চিত হয়েছিলেন মর্মেও অনিয়ম,স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। যেমন- বানিজ্যিক ব্যাংক গুলো থেকে প্রকৃত ভুক্তভোগীরা বঞ্চিত হয়েছে। বিশেষতঃ মাঝারী ও ছোট ব্যাবসায়ীরা প্রয়োজনীয় সহযোগিতা না পাওয়ার কারনে অনেকেরই ব্যবসা বানিজ্য গুটিয়ে ফেলতে হয়েছে। অনেক ব্যাবসায়ী যারা জেলা শহরে থাকতো তারা নিজ নিজ গ্রামে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছে। ফলে শহরে যাদের বাড়ীভাড়ায় একমাত্র অবলম্বন ছিল এসব অসংখ্য মানুষের বাড়ী খালি হয়ে যাওয়ায় সীমাহীন অর্থ সংকটে পড়ে এসব মানুষ। পরবর্তীতে করোনার প্রাদুর্ভাব কিছুটা নিম্নগামী হলে মানুষ আবারও ঘুরে দাড়াতে প্রানপণ প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকে। বিগত মে ২০২০ মাসের পর হতে ক্রমান্বয়ে লকডাউনও আস্তে আস্তে শিথিল হতে থাকলে আশায় বুক বাঁধে মানুষ। ইতোমধ্যে সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টায় করোনা ভ্যাকসিন এর প্রথম চালান আসলো।আশান্বিত হলো মানুষ। আতংক,ভয়-ভীতি লোপ পেতে থাকে অনেকটা। মানুষ পূর্বের চেয়ে অপেক্ষাকৃত স্বাভাবিক হতে চলেছে। কিন্তু বিধি বাম! ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজ চলাকালীন করোনা ভাইরাস আবারো ক্ষেপে গিয়ে পূর্বাপেক্ষা অধিকতর শক্তিশালীরূপে আবির্ভূত হয়। ফলে সংক্রমন ঠেকাতে আবারো লকডাউনের ঘোষনা দিল সরকার। বিশ্বের কিছু কিছু রাষ্ট্রেও ২য় দফা লকডাউন চলছে। তবে বাংলাদেশের মত রাষ্ট্রে কেবল লকডাউনকেই বিকল্প ভাবা হলে রাষ্ট্রের সমূহ ক্ষতির বিষয়টিও এড়িয়ে যাওয়া সমীচীন হবে না। ইতোপূর্বেকার লকডাউনের ক্ষত এখনো শুকায়নি এবং শুকাতে কতদিন লাগে তা একমাত্র আল্লাহই ভাল জানে। সরকার দেশ ও মানুষের কল্যাণে যেকোন কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে পারে ঠিকই। তবে স্মরণ রাখতে হবে যে, মানুষের জীবন ও জিবিকা একটি অপরের পরিপূরক। সুতরাং এক্ষেত্রে যাতে কোন ব্যত্যয় না ঘটে তা সরকারের আমলে নেয়া উচিৎ। উল্লেখ্য যে, লকডাউনের ঘোষনার সাথে সাথে ব্যাবসায়ীরা রাস্তায় নেমে গেলেন। এর মাধ্যমে কি ম্যাসেজ দিলেন ব্যাবসায়ীরা। মূলতঃ পবিত্র রমজান মাসকে কেন্দ্র করেই কিছু ব্যবসা বানিজ্য হয়। যেজন্য ধার কর্জ করে ব্যাবসায়ীরা পূঁজি বিনিয়োগ করে। এমতাবস্থায় লকডাউন অব্যাহত থাকলে পূঁজি হারিয়ে এদের পথে বসতে হবে। এ আশংকায় ব্যবসায়ী মহলে অসন্তোষ বিরাজ করছে। এছাড়া ব্যাংক ঋণ, ক্রেডিট কার্ড ঋণ, গাড়ি-বাড়ীর বিপরীতে গৃহীত ঋণের কিস্তি এর টাকা পরিশোধের বাধ্যবাধকতাতো তো থেকেই যায়। অতএব এসব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কার্যকর নির্দেশনার আবশ্যকীয়তা রয়েছে। যেহেতু করোনা মহামারী ক্রমাগত ভয়াবহতার দিকে এগুচ্ছে,সেহেতু লকডাউন এর প্রয়োজনীয়তাও উপেক্ষিত হবার নয়। পাশাপাশি স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরাও কঠোর লকডাউন এর উপর জোর দিচ্ছে। এমনকি প্রয়োজনে কার্ফিউ জারির পক্ষেও মতামত দিচ্ছে। যে ভিত্তিতে সরকারও ইতোমধ্যে আগামী ১৪ এপ্রিল হতে কঠিন লকডাউনের ঘোষনা দিয়েছে । এমতাবস্থায় সরকারকে আবশ্যকীয় কিছু বিষয়ের উপর নজর দেয়া উচিত বলে মনে করি। যেমন-একদিকে করোনা আক্রান্তদের নিরবচ্ছিন্ন চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে হবে। যেজন্য হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ শয্যা বাড়ানো, আইসোলেসন সেন্টার বৃদ্ধি করা। সর্বোপরি যে সমস্ত হাসপাতালে নিজস্ব অক্সিজেন প্লান্ট নেই সেগুলোতে জরুরি ভিত্তিতে অক্সিজেন প্লান্ট স্হাপন করা । ঊপরন্তু ফ্রন্ট লাইনার ডাক্তার, নার্স ও চিকিৎসাসেবীদের আলাদা থাকা খাওয়ার সুব্যবস্হা করতে হবে। অপরদিকে সাধারণ মানুষ যাতে না খেয়ে মারা না যায় তজ্জন্য সঠিকভাবে সরকারি সহায়তা অব্যাহত রাখতে হবে। প্রকৃত ভুক্তভোগীদের নির্ভেজাল তালিকা তৈরি করে ঘরে-ঘরে সরকারী সহায়তা পৌছে দিতে হবে। যা এলাকা ভিত্তিক সর্বদলীয় কমিটি গঠন পূর্বক নিরপেক্ষ তালিকা তৈরি করার মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাবসায়ীদের ট্রেড লাইসেন্স অনুপাতে নুন্যতম তিন বছরের জন্য আর্থিক প্রনোদনা দেবার উদ্যোগ গ্রহন করতে হবে। প্রয়োজনীয় পন্য আমদানির ক্ষেত্রে ন্যুনতম মার্জিন বা কমিশনে এলসি ওপেনিং এর সুযোগ দেয়া,পন্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে মনিটরিং সেল গঠন, জনগণ ন্যায্যমূল্যে খাদ্যদ্রব্য যাতে ক্রয় করতে পারে তজ্জন্য রেশনিং কার্ড প্রথা চালু করা। চাকুরীজীবিদের বেতনের নিশ্চয়তা প্রদান করতে হবে। সরকারি বেসরকারি কোন চাকুরীজীবিকে লে-অফ কিংবা টার্মিনেশনের আওতায় আনা যাবে না। পূর্বের ব্যাংক ঋণের কিস্তি পরিশোধের সময় বৃদ্ধি করে সুদ মওকুফ করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ক্রেডিট কার্ড ব্যাবহারকারীদের সুদ মওকুফ ও কিস্তির সময়সীমা বৃদ্ধি করতে হবে। পাশাপাশি গরীব দুস্থদের প্রতি সহায়তার হস্ত প্রসারিত করতে বিত্তবানদের উৎসাহিত করতে হবে।

আলহাজ্ব এইচ এম মুজিবুল হক শুক্কুর
লেখক-উন্নয়ন সংগঠক ও রাজনীতিবিদ।
ই-মেইলঃ hmmujibulhoque70@yahoo.com

সূত্রঃ দৈনিক পুর্বকোণ, ১৮ এপ্রিল ২০২১

Comments

comments

Related Post